রাধারমণ দত্ত (১৮৩৩-১৯১৫) সম্পর্কে আরও গভীরে জানতে হলে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ধামাইল’ গান ও নাচের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝা জরুরি।
১. পারিবারিক পটভূমি ও শৈশব
বংশ পরিচয়: তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের এক বিদগ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রাধামাধব দত্ত ছিলেন একজন সংস্কৃত পণ্ডিত এবং কবি, যিনি ‘গীতগোবিন্দ’-এর অনুবাদ করেছিলেন। পিতার এই সাহিত্যচর্চা রাধারমণকে শৈশব থেকেই প্রভাবিত করে।
পারিবারিক বিয়োগান্তক ঘটনা: তাঁর স্ত্রী গুণময়ী দেবী এবং চার ছেলের মধ্যে তিন ছেলেই অকালে মারা যান। এই শোক তাঁকে জীবনের গভীর সত্য অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করে এবং তিনি ধীরে ধীরে সংসার ত্যাগী বৈরাগী জীবনে প্রবেশ করেন।
২. আধ্যাত্মিক সাধনা ও গুরু
গুরুর দীক্ষা: বৈরাগ্য জীবনে তিনি মৌলভীবাজারের ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর (রঘুনাথ ভট্টাচার্য) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
সহজিয়া বৈষ্ণব মতবাদ: তিনি শাক্ত, শৈব ও বৈষ্ণব সহ বিভিন্ন মতবাদ চর্চা করলেও শেষ পর্যন্ত বৈষ্ণব সহজিয়া মতে থিতু হন।
নলুয়ার হাওরের আশ্রম: গুরুর নির্দেশে তিনি নিজ গ্রামের কাছে নলুয়ার হাওরের তীরে একটি পর্ণকুটির তৈরি করে ৩২ বছর সাধনা করেন। কথিত আছে, তিনি ভাবাবিষ্ট হয়ে অনর্গল গান গেয়ে যেতেন এবং তাঁর শিষ্যরা তা লিখে রাখতেন।
৩. ধামাইল গান ও নাচের জনক
রাধারমণ দত্তকে সিলেটের লোকসংগীতের অনন্য শাখা ধামাইল গানের প্রবর্তক ধরা হয়।
পরিবেশনা: ধামাইল গান মূলত নৃত্যভিত্তিক লোকসংগীত, যা সমবেত নারীকণ্ঠে পরিবেশিত হয়। ১০ থেকে ২৫ জন নারী চক্রাকারে দাঁড়িয়ে তালে তালে করতালি দিয়ে এই গান ও নাচ পরিবেশন করেন।
বৈশিষ্ট্য: সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ধামাইলের করতালিকে ‘থাপরি’ বলা হয়। ভাটি অঞ্চলের ধামাইল গানের প্রায় ৯৫ শতাংশই রাধারমণ দত্তের রচিত।
উপযোগিতা: বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাঙালি হিন্দু বিয়েতে ধামাইল গান একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪. রাধারমণ ও হাছন রাজা
রাধারমণ দত্ত তাঁর সমসাময়িক মরমী কবি হাছন রাজার চেয়ে ১৪-১৫ বছরের বড় ছিলেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে গভীর হৃদ্যতা ছিল। একবার হাছন রাজা গানের মাধ্যমে তাঁর কুশল জানতে চেয়েছিলেন— “রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়”, উত্তরে রাধারমণও গানের মাধ্যমেই জবাব দিয়েছিলেন।
৫. উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় গান
তাঁর রচিত তিন সহস্রাধিক গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
ভ্রমর কইয়ো গিয়া (শ্রীকৃষ্ণ বিরহের কালজয়ী গান)
কৃষ্ণ আইলা রাধারি কুঞ্জে (বিয়ের অনুষ্ঠানে বহুল গীত ধামাইল গান)
করেঙ্গিলা একি দশা
কলঙ্কিনী রাধা
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে
সুনামগঞ্জের কেশবপুরে বর্তমানে তাঁর একটি সমাধিমন্দির রয়েছে এবং সেখানে সরকার একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।