```
মাওলানা ইয়াসিন শাহ

মাওলানা ইয়াসিন শাহ

মরমী সাধক ও গীতিকার


7
মোট গান
318
মোট পঠিত

জীবনী ও দর্শন

সুফি সাধক ফকির ইয়াছিন শাহ (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত মরমি বাউল ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাশহরের লক্ষ্মীপুর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন, সময়কাল আনুমানিক ১৮৫০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে। তাঁর পিতা হাজী মুন্সী নূর আলী এবং মাতা নছিবা বিবি।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহ মনির উদ্দিন মধ্যভারতের মানিকপুর থেকে এসে প্রথমে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট অঞ্চলের কাইছনাজুরি গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধর সৈয়দ নূর আলী ত্রিপুরার লক্ষ্মীপুরে গিয়ে স্থায়ী হন। এখানেই ইয়াছিন শাহের জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হন। পিতার আগ্রহে তিনি প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত হন এবং টাইটেল শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন, তবে চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন না করেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই তিনি গভীর চিন্তাশীলতা, আত্মজিজ্ঞাসা এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিবেদিত করেন। দুনিয়াবিমুখ জীবনযাপন ও আত্মশুদ্ধির কারণে তিনি পরবর্তীতে “তরকে দুনিয়া” সাধক হিসেবে পরিচিতি পান এবং ফকির ইয়াছিন শাহ নামেই ব্যাপকভাবে পরিচিত হন।

ইয়াছিন শাহ ছিলেন নির্লোভ, সংসারবিমুখ এবং গভীর ভাবসাধনার মানুষ। তাঁর জীবন ছিল একান্তভাবে আল্লাহর ধ্যানে ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে সমাজের অন্যায়-অবিচার, শোষণ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নসিহত করতেন এবং মানুষকে সচেতন করার জন্য বহু গজল ও ভাবসংগীত রচনা করেন। ধারণা করা হয়, তিনি প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মরমি গান রচনা করেছিলেন।

তাঁর রচিত ও সংকলিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “এস্কে খোদা হুব্বে রাসুল (সা.)”। তাঁর কিছু জনপ্রিয় গান আজও মরমি সাধকদের মধ্যে প্রচলিত, যেমন—“ধিয়ানে না মিলে তারে…”, “পাগল করিল গো বন্ধের রূপের কিরণ গো”, এবং “যেই অবধি হইছিল দেখা গো সোনা বন্ধুয়ার সনে”।

বিশিষ্ট লোকসাহিত্য গবেষক আশরাফ হোসেন সাহিত্যরত্ন তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াছিন শাহ ছিলেন সিলেট ও ত্রিপুরা অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ধারার এক বিশিষ্ট প্রতিনিধি, যার পীর-মুরিদি ও আধ্যাত্মিক প্রভাব দুই অঞ্চলেই বিস্তৃত ছিল। তিনি তাঁর গভীর সাধনা ও জ্ঞানের কারণে সেই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মরমি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।

ইয়াছিন শাহের বংশধারা আজও বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত রয়েছে। তাঁর ছয়জন পুত্র সন্তান ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর একমাত্র খলিফা হিসেবে হযরত শাহ আজম (রহ.)-এর নাম উল্লেখ করা হয়।

প্রতি বছর ১২ মাঘ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ইসালে সওয়াব অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের ত্রিপুরার কৈলাশহরের লক্ষ্মীপুরে তাঁর মাজার শরিফ অবস্থিত, যেখানে বড় পরিসরে ওরস, কোরআন খতম, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশের কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও চুনারুঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায়ও তাঁর স্মরণে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়।

ফকির ইয়াছিন শাহ (রহ.) ছিলেন একাধারে মরমি কবি, সুফি সাধক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর ভাব ও গান আজও ভক্তদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে।